জনসাধারণের প্রকাশ্য প্রতিবাদের মুখে অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে বের হয়ে যাওয়া মাওবাদীরা কেরালা, কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, এবং দক্ষিণের অন্যান্য রাজ্যের দিকে তাদের দৃষ্টি নিবন্ধ করেছে ৷
বিশ্লেষকরা বলেন, মাওবাদী জঙ্গিরা তাদের প্রভাব বাড়ানোর আশা নিয়ে দক্ষিণের দিকে তাদের দৃষ্টি নিবদ্ধ করেছে ৷ উত্তর-পূর্বে আসামে এবং পশ্চিমে মহারাষ্ট্রে অনুরূপ সম্প্রসারণের পর দক্ষিণদিকে তাদের নজর পড়েছে ৷
একজন প্রাক্তন আইপিএস (ইন্ডিয়ান পুলিশ সার্ভিস) কর্মকর্তা এবং ভারতে মাওবাদী কর্মকাণ্ড সম্পর্কে বিশেষজ্ঞ প্রকাশ সিং বলেন, “এই নিষিদ্ধ দলটির মূল লক্ষ্য হলো পূর্ব ও পশ্চিমের পর্বতশ্রেণীগুলোকে দক্ষিণের রাজ্যগুলোর মাধ্যমে সংযুক্ত করা”।
তিনি খবর দক্ষিণ এশিয়ার কাছে ব্যাখ্যা করেন, “পশ্চিমের পর্বতশ্রেণী পাঁচটি রাজ্যের মধ্য দিয়ে অতিক্রম করেছে, এর মধ্যে রয়েছে কর্ণাটক, তামিলনাড়ু, কেরালা, গুজরাট, মহারাষ্ট্র, ও গোয়া ৷ পর্বতগুলো যে ২,২০০ কিলোমিটারজুড়ে বিস্তৃত, তার মধ্যে সবচেয়ে গভীর জঙ্গল রয়েছে কর্ণাটকে, এবং মাওবাদীরা এর সুবিধা নেয়ার পরিকল্পনা করছে ৷ চরমপন্থীরা কেরালার ওয়াইয়ানাদে একটি ঘাঁটি তৈরি করতে চায় এবং জঙ্গলের মধ্য দিয়ে কর্ণাটকের মাইশুরে যাওয়ার একটা পথ করে নিতে চায়”।
তামিলনাড়ু কর্তৃপক্ষ সম্প্রতি একজন সন্দেহভাজন জঙ্গিকে গ্রেপ্তার করেছে যিনি এই রাজ্যে মাওবাদী কার্যক্রম প্রতিষ্ঠা করার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছে বলে কর্তৃপক্ষ জানায় ৷
তামিলনাড়ু পুলিশের মহাপরিচালক কে. রামানুজাম খবরকে বলেন, “গোপন সংবাদের ভিত্তিতে পুলিশের কিউ শাখার সদস্যরা নিষিদ্ধ মাওবাদী দলের রাজ্য শাখার সম্পাদক ২৯ বছর বয়স্ক বিবেক, ওরফে কুমারকে চেন্নাইয়ের শেনয় নগরের একটি অ্যাপার্টমেন্ট থেকে গ্রেপ্তার করে, কিন্তু তার স্ত্রী পালিয়ে যেতে সক্ষম হয়”।
তিনি বলেন, “বিবেক পেরিয়াকুলামের জঙ্গলে স্থানীয় মাওবাদী কর্মীদেরকে সশস্ত্র প্রশিক্ষণ দিচ্ছিল”।
বিদ্রোহীরা অন্ধ্রপ্রদেশে অতিরিক্ত সময় থাকছে
ভারতে একটি “লাল করিডোর” তৈরির জন্য তাদের অনুসন্ধান চালিয়ে যাওয়া ছাড়াও, মাওবাদীদের সম্প্রসারণের প্রচেষ্টার পেছনে আরেকটা তাৎক্ষণিক উদ্দেশ্য থাকতে পারে ৷ বিশেষজ্ঞরা বলেন, জঙ্গিদের সহিংস কৌশলগুলোর বিরুদ্ধে জনগণের প্রকাশ্য প্রতিবাদের কারণে তারা অন্ধ্রপ্রদেশ থেকে বের হয়ে যেতে বাধ্য হওয়ার ফলে তাদের জন্য সংঘটিত ক্ষয়ক্ষতিগুলো তাদের কাটিয়ে ওঠা প্রয়োজন ৷
অপহরণ, খুন, চাঁদাবাজি ও স্যাবোটাজ ছিল দীর্ঘদিন ধরে সশস্ত্র জঙ্গিদের মূল হাতিয়ার ৷ সরকারের উন্নয়ন কর্মসূচি প্রভাব ফেলা শুরু করার সাথে সাথে, সহিংতা ও ভীতিপ্রদর্শনের কারণে স্থানীয় জনগণের বিরক্তি বেড়ে যাওয়ার ফলে এই রাজ্যে মাওবাদীদের সহায়তার ভিত্তি নড়ে উঠেছে ৷
নয়া দিল্লী-ভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর কনফ্লিক্ট ম্যানেজমেন্টের প্রতিষ্ঠাতা অজয় সাহনি বলেন, “মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থার উন্নতি হওয়ার ফলে, তারা মাওবাদীদের প্রতি আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে এবং এমনকি বহু জায়গায় তাদেরকে এড়িয়ে চলছে ৷ এই রাজ্যে জনগণের প্রকাশ্য প্রতিবাদ দেখা গেছে, যার ফলে চরমপন্থীরা তাদের কার্যক্রম সীমিত করতে এবং অন্য প্রদেশে আশ্রয় চাইতে বাধ্য হয়েছে”।
তিনি খবরকে বলেন, “রাজ্য সরকার যা করেছে তা হচ্ছে বিশাল সেচ প্রকল্প হাতে নেয়া, রাস্তা তৈরি করা এবং সেইসাথে জনকল্যাণমূলক পদক্ষেপ নেয়া যার ফলে কর্মসংস্থানের সৃষ্টি হয়েছে, এবং সেইসাথে আয়ের পথ সুগম হয়েছে, যার ফলে সেই সময় পর্যন্ত বেকার থাকা তরুণরা মাওবাদের প্রতি সব আগ্রহ হারিয়ে ফেলেছে”।
সাহনি উল্লেখ করেন, অন্ধ্র প্রদেশের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী কে রোসাইয়া ২০০৯-২০১০ এ ক্ষমতায় থাকাকালে শ্রমিকদের মজুরি বৃদ্ধি করেন, চালের দাম কমান, এবং বিভিন্ন ধরনের জনকল্যাণমূলক প্রকল্প শুরু করেন ৷ “এই সবকিছু এবং মাওবাদীদের ক্রমবর্ধমান সহিংসতার ঘটনাগুলো অন্ধ্র প্রদেশে চরমপন্থীদের বিরুদ্ধে জনবিক্ষোভ বৃদ্ধিতে সহায়তা করেছে”।
বর্তমানে সমাজকর্মে আত্মনিয়োগ করা একজন প্রাক্তন মাওবাদী ভাবাদর্শী সীতারাম শাস্ত্রী খবরকে বলেন, আইন-শৃঙ্খলার আরো কার্যকর প্রয়োগও এক্ষেত্রে ভূমিকা রেখেছে ৷
তিনি বলেন, “মাওবাদীদের মোকাবেলা করার জন্য রোসাইয়া এই রাজ্যের পুলিশ বিভাগে ৩৭,০০০ নতুন পদ সৃষ্টি করেন এবং একটি পুলিশ অ্যাকাডেমি প্রতিষ্ঠা করেন ৷ সর্বাধুনিক ও সবচেয়ে উন্নত প্রযুক্তি চালু করার ফলে তা পুলিশকে আরো ভালোভাবে যোগাযোগ রক্ষায় সাহায্য করেছে, এবং সেইসাথে সরকারও ছত্রিশগড়ের সীমান্তে অবস্থিত উত্তরের জেলাগুলোর বন এলাকায় রাস্তা-ঘাট, স্কুল, থানা এবং আরো বিভিন্ন ধরনের দপ্তর স্থাপনের মাধ্যমে একটি নিরেট ব্যবস্থা গড়ে তুলেছে”।
তিনি যোগ করেন, “একই সাথে, সরকার পুনর্বাসন কর্মসূচি ঘোষণা করেছে, অস্ত্র পরিত্যাগকারী মাওবাদীদের জন্য সেগুলো বাস্তাবায়ন করেছে, এবং তাদের জন্য নতুন কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করেছে”।
আত্মপ্রসাদের কোনো অবকাশ নেই
ভারতের অন্যান্য যে সব জায়গায় জঙ্গিরা তাদের উপস্থিতি জানান দিচ্ছে সেগুলোতে এই গল্পের পুনরাবৃত্তি ঘটবে কিনা তা একটি খোলা প্রশ্ন ৷ শাস্ত্রীর মতে, জঙ্গিরা যে বিপত্তির সম্মুখীন হয়েছে তা সত্ত্বেও জঙ্গিদেরকে খাটো করে দেখা অবশ্যই উচিত হবে না ৷
শাস্ত্রী খবরকে বলেন, “মাওবাদীরা দীর্ঘদিন ধরে চেষ্টা চালিয়ে যেতে সক্ষম ৷ তারা হয়তো প্রতিকূলতার মুখোমুখি হয়েছে, তাদের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা হয়তো মুখোমুখি লড়াইয়ে মারা গেছে, কিন্তু তারপরেও তারা নতুন প্রতিহিংসা নিয়ে প্রতিআক্রমণ করতে পারে ৷ এখানে আত্মপ্রসাদের কোনো অবকাশ নেই”।
মন্তব্য পোস্ট করুন (মন্তব্য দেয়া সম্পর্কিত নীতিমালা)* আবশ্যক ঘরগুলো নির্দেশ করছে
পাঠকের মন্তব্য
saraswathiJuly 16, 2012 @ 02:07:45AM
চমৎকার নিবন্ধ, যিনিই এটা প্রকাশ করুন না কেন তাকে একটা স্বর্ণের চামচ দেয়া উচিত ৷
ramaniJune 21, 2012 @ 01:06:42PM
খুব ভালো৷ আপনাকে নিয়মিতভাবে অনুসরণ করবো ৷ আমার কিছু সমস্যা আছে৷ দয়া করে নিয়মিতভাবে সত্যমেব জয়তে চালিয়ে যাবেন ৷