রোমান্টিক প্রেমের স্বপ্ন নিয়ে রূপালী পর্দাজুড়ে থাকতেন যে অভিনেতা, মুম্বাইয়ে তার সম্মানে হাজির হয়েছিলেন হাজার হাজার মানুষ।
রোমান্টিক নায়ক হিসাবে তার অবস্থান শেষ হয়ে গেছে অনেক আগেই। তারপরও সকল শ্রেণীর মানুষের ভারতীয় রূপালী পর্দার কিংবদন্তি রাজেশ খান্নার মৃত্যুতে অতীতবিধুরতায় আক্রান্ত হয়েছিলেন। দীর্ঘ রোগভোগের পর গত বুধবার (১৮ জুলাই) মুম্বাইতে নিজের বাড়িতে মারা যান তিনি। তাঁর বয়স হয়েছিল ৬৯।
খবর দক্ষিণ এশিয়াকে এ বিষয়ে বলতে যেয়ে এসময়ের শীর্ষস্থানীয় চিত্র পরিচালক মহেশ ভাট বলেন, “তিনি ছিলেন বলিউডের প্রথম সুপারস্টার। এবং চলচ্চিত্রে তার অনুসৃত ধারা এখনও চলছে এই উপমহাদেশের সর্বত্র।
বৃহস্পতিবার দক্ষিণ মুম্বাইয়ের ভিলে-পার্লে শ্মশানে যখন তাকে নিয়ে যাওয়া হয়, তার শবযানের পেছনে হাজার মানুষের শোভাযাত্রা তৈরি হয়। এসময় প্রবল বৃষ্টি হয়, কিন্তু এই বৃষ্টিও থামাতে পারেনি ফুলে ফুলে সাজানো সেই শবযানকে অনুসরণ করতে থাকা হাজার হাজার মানুষের যাত্রাকে। এদের মধ্যে বলিউডে বর্তমানে যারা রাজত্ব করছেন, তারাও ছিলেন।
খান্নার সমসাময়িক, হিন্দি সিনেমার এ যাবতকালের শ্রেষ্ঠ তারকা অমিতাভ বচ্চনও এই ভীড়ের মধ্যে ছিলেন। তার সঙ্গে ছিলেন তার ছেলে বর্তমানের আর এক তারকা অভিযেক বচ্চন।
খান্না’র নয় বছর বয়স্ক নাতি, তার মেয়ে টুইঙ্কলের ছেলে, আরাভ, হিন্দু রীতি অনুযায়ী তার মুখাগ্নি করে।
রাজেশ খান্নাকে শ্রদ্ধা জানিয়েছে সমাজের বিভিন্ন শ্রেণীর মানুষ। যেমন, তার শোক সন্তপ্ত পরিবারকে সান্তনা জানিয়ে চিঠি লিখেছেন ভারতের প্রধানমন্ত্রী মনমোহন সিং, তেমনি পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী রাজা পারভেজ আশরাফও একটি শোকবার্তা পাঠিয়েছেন, আর তাতে তিনি রাজেশ খান্নাকে অভিহিত করেছেন “একজন মহান অভিনেতা, যার অবদান চলচ্চিত্র এবং শিল্প জগত সবসময়ই মনে রাখবে” হিসাবে।
তার শেষকৃত্যের এই দিনটিতে শোক জানাতে আসলে ভারতের পুরো চলচ্চিত্র শিল্পই যেন এক দিনের জন্য বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। ভারতীয় টিভি চ্যানেলগুলো বিরতিহীন ভাবে প্রচার করছিল রাস্তায় দাঁড়িয়ে থাকা মানুষের কথা, আর তারা বলছিলেন মহান এই অভিনেতার জীবন এবং সময় সম্পর্কে তাদের অভিমত।
“শেষ রোমান্টিক নায়ক”
রাজেশ খান্নার জন্ম বুরেওয়ালা শহরে, এটি এখন পাকিস্তানেরঅংশ। ছাত্র অবস্থায় যখন তিনি মুম্বাইয়ে লেখাপড়া করতেন, তখনই তিনি অভিনয় জগতের প্রতি আগ্রহ দেখান। অভিনয় করতে শুরু করেন শখের থিয়েটারে।
রাজেশ খান্না এমন একটা দেশে রোমান্টিক আদর্শ হিসাবে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন, যেখানে বিয়ে জাত-পাত এবং যৌতুক খুবই গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
সিনে ব্লিটজ ম্যাগাজিনের চলচ্চিত্র সমালোচক মায়া রঙ্গরাজন বলেন, “এখানে আজকের দিনে পর্যন্ত বিয়ের আগে ছেলে এবং মেয়েরা দেখা করে না, তো সেখানে ১৯৭০ এর আমলে তো কথাই বলতে পারতো না। অথচ সেই সময়েই রাজেশ খান্না পর্দায় ঝড় তুলেছিলেন। প্রতিটি যুবক যুবতীর হৃদয়ে থাকা প্রকৃত প্রেমকে তিনি জাগিয়ে তুলেছিলেন”।
মারাঠী লেখক রনজিৎ মানকেকর বলিউডের ইতিহাস নিয়ে পাঁচটি বই লিখেছেন। খবরকে তিনি বলেন, “ভারতীয় চলচ্চিত্রে, দু’একটা ব্যতিক্রম ছাড়া বাকী সবক্ষেত্রেই ছেলে মেয়ের প্রেমের পরিণতি দেখানো হতো বিশাল আনন্দঘন বিয়ের মধ্যে দিয়ে। কিন্তু রাজেশ খান্নাই প্রথম প্রেমের জটিল পরিণতি বিষয়টিকে পর্দায় নিয়ে আসার সাহস দেখাতে পারলেন। তিনি এই বার্তাটিই সকলের কাছে পৌছে দিলেন যে, প্রকৃত প্রেমের সঙ্গে জড়িয়ে রয়েছে বেদনা আর আত্মত্যাগের বিষয়গুলোও”।
খান্না সেই সময়ের শীর্ষস্থানীয় নায়িকাদের সঙ্গে যেমন- নন্দা, শর্মিলা ঠাকুর, জিনাত আমান, হেমা মালিনি, তনুজা, ওয়াহিদা রহমান, মুমতাজের সঙ্গে অভিনয় করেছেন। এদের মধ্যে মুমতাজের নামটা বিশেষভাবে উল্লেখ করা যায়, কারণ তার সঙ্গে ১৯৭০ এর শুরুর দিকে, খান্নার আটটি সুপারহিট চলচ্চিত্র রয়েছে।
ঋষিকেশ মুখার্জীর আনন্দ (খুশি, ১৯৭০) ছবিতে তিনি অভিনয় করেছিলেন ভারতীয় সিনেমার সবচেয়ে স্মরণীয় চরিত্রটিতে। এটি ছিল একজন তরুণ মেডিকেল ছাত্রের জীবন, যে কিনা ক্যান্সারের শেষ পর্যায়ের রোগী ছিল। অন্যান্য হিন্দি সিনেমার মত, আনন্দতেও গান ছিল। ওই ছবিতে একটা গানের দৃশ্য আছে, তার অভিনীত চরিত্রটি ‘জিন্দেগি ক্যায়সে হ্যায় পাহেলি’ (জীবনের ধাঁধাঁ- এই গানটি গেয়েছিলেন মান্না দে) গানটি গাইতে গাইতে মুম্বাইয়ের চৌপাত্তি সমুদ্রসৈকতে হাঁটছিলেন।অনেকের মতে, এই গানের দৃশ্যটি ভারতের চলচ্চিত্র জগতের সবচেয়ে সফল গানের দৃশ্যগুলোর একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়।
খান্না মোট ১৬৩ টি চলচ্চিত্রে অভিনয় করেছেন। আখরি খত (শেষ চিঠি, ১৯৬৬) ছিল তার প্রথম চলচ্চিত্র। তবে তিনি প্রথম আলোচনায় আসেন ১৯৬৯ সালের আগে আলোচনায় আসতে ব্যর্থ হন।। সেটি ছিল তার সাফল্যের শুরুর বছর। ওই বছরেই তিনি শর্মিলা ঠাকুরের সঙ্গে অভিনয় করেন আরাধনা (গৌরব, ১৯৬৯) চলচ্চিত্রে। শর্মিলা ঠাকুর তখন জনপ্রিয় নায়িকাদের একজন। ছবিটিকে এখনো সর্বকালের সফল ছবিগুলোর একটি হিসাবে বিবেচনা করা হয়। এই চলচ্চিত্রে তিনি দ্বৈত চরিত্রে অভিনয় করেছিলেন, প্রথম অভিনয় করেছিলেন একজন বিমান বাহিনীর পাইলটের চরিত্রে, যার সঙ্গে নাকি প্রেম ছিল শর্মিলা ঠাকুরের। আর পরের চরিত্রটা ছিল তাদের সন্তানের, যাকে ঠাকুর তার পিতার আদর্শে বড় করছিল।
মুমতাজের মধ্যে আসলে পান তিনি তার পর্দার জুটি। ভাট স্মৃতিচারণ করে বলেন, “মুমতাজের সঙ্গে তার কি যেন একটা রসায়ন ছিল, পর্দায় সেটি চমৎকারভাবে প্রতিভাত হতো। এটা সেই সময়ের আর কোন নায়িকার সঙ্গে তার হয়নি”।
এই দুই জন অভিনয় করেছেন, বন্ধন (জোড়া, ১৯৬৯), দো রাস্তে (দুই পথ, ১৯৬৯), সাচ্চা ঝুটা (সত্য এবং মিথ্যা, ১৯৭০), দুশমন (শত্রু,১৯৭২), আপনা দেশ (আমার দেশ, ১৯৭২), আপ কি কসম (তোমার শপথ, ১৯৭৩), রোটি (রুটি, ১৯৭৪) এবং আয়না (আয়না, ১৯৭৭)।
নিউজ চ্যানেল এনডিটিভিতে স্মৃতিচারণ করতে যেয়ে মুমতাজ বলেন, “আমার মনে হয়, আমাদের নতুনত্বকেই ওই সময় দর্শকরা পছন্দ করেছিল। আমি এবং রাজেশ-দু’জনেই তখন ইন্ডাস্ট্রিতে জায়গা করে নেয়ার জন্য সংগ্রাম করছিলাম, আর সেই কারণে আমরা আমাদের উজাড় করে দিয়েছিলাম। তার অন্যান্য নায়িকাদের অধিকাংশই ছিল তখন প্রতিষ্ঠিত”।
ভাট বলেন, “রাজেশ খান্নার কোন পুরুষালী আকর্ষণ ছিল না; তিনি ছিলেন নরম প্রকৃতির, অনুভূতি প্রবণ, যেন পাশের বাড়ির ছেলেটির মত। তিনি ছিলেন আমাদের শেষ রোমান্টিক নায়ক। তার পর থেকেই শুরু হয় মারদাঙ্গা নায়কদের যুগ। আর এদের মধ্যেই শ্রেষ্ঠ হচ্ছেন অমিতাভ বচ্চন”।
বচ্চনকে ভারতীয় সিনেমা প্রেমিকরা অসম্ভব শ্রদ্ধা করে থাকেন। এই বচ্চনের সঙ্গে রাজেশ খান্না আনন্দ এবং নামক হারাম (বিশ্বাসঘাতক,১৯৭৫) ছবিতে অভিনয় করেছেন। ভাট বলেন, “এই দুই ছবিতেই দর্শকদের মনে কে বেশি দাগ কাটতে পেরেছিল তা নিয়ে বিতর্ক রয়ে গেছে। তবে বেশির ভাগ ভোটই যে রাজেশের দিকে পড়বে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই”।
উত্তাল জীবন
কিন্তু পর্দার বাইরের ব্যক্তিগত জীবন, বচ্চনের মত সুস্থির হয়নি তার। ভারতীয়রা যেমনটি পছন্দ করে, বচ্চনের পারিবারিক জীবন যেন সেরকমই সুস্থির। আর বিপরীত দিকে খান্নার ব্যক্তিগত জীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছিল নানা ঘটনায়।
খবরকে লেখক মানকেকার বলেন, “তিনি বেশ কয়েকজন সহ অভিনেত্রী এবং মডেলের সঙ্গে নানা সম্পর্কে জড়িয়ে পড়েছিলেন। ১৯৭৩ সালে তিনি সেই সময়ের টিনএজ তারকা ডিম্পল কাপাডিয়া কে বিয়ে করেন। তাদের বয়সের পার্থক্য ছিল ১৫ বছর। তাদের বিবাহিত জীবনের ১২টি বছরই কেটেছে নানা ঝড়-ঝাপটায়। সবচেয়ে বেদনাদায়ক হচ্ছে, তার ছিল মদ্যপানের বদভ্যাস, যা কিনা চলচ্চিত্র জগতের সঙ্গে তার সম্পর্ককে নষ্ট করে দিয়েছিল”।
১৯৮৫ সালে ডিম্পল রাজেশ খান্নার বাড়ি থেকে বের হয়ে আবার তার ক্যারিয়ার শুরু করলে তাদের বিয়েটা অকার্যকর হয়ে পড়ে। এর আগে পর্যন্ত ডিম্পল মাত্র একটি ছবিই করেছিলেন, সেটি ছিল ববি (১৯৭৪),এমন শোনা যেত যে, বিয়ের পর রাজেশ নাকি ডিম্পলকে গতানুগতিক ভারতীয় গৃহবধুর মতো ঘরে থাকতে বাধ্য করেছিলেন। আর একই সময় তিনি নিজে বোহেমিয়ান স্টাইলে জীবন যাপন করেছেন, যার চুড়ান্ত প্রতিফলন দেখা গেছে তার শারীরিক অবস্থায়।
আলাদা থাকলেও ডিম্পল এবং রাজেশের মধ্যে কখনোই কিন্তু আনুষ্ঠানিক ছাড়াছাড়ি হয়নি। ২০০০ সাল পর্যন্ত তারা আলাদাই থাকতেন, তারপর “তারা একটা সমঝোতায় আসেন,” বলে ইন্ডাস্ট্রি সূত্রে জানা যায়। তার এই যে দীর্ঘ দিন ধরে চলতে থাকা অসুস্থতা, যা তাকে শেষ পর্যন্ত মৃত্যু পর্যন্ত নিয়ে গেছে, এই পুরো সময়টা ডিম্পল তার পাশেই ছিলেন।
রাজেশ খান্নার এই বর্ণাঢ্য জীবনের মধ্যে অল্প সময়ের জন্য রাজনৈতিক জীবন-ওছিল। ১৯৯১ সালে সংসদ নির্বাচনে তিনি নয়া দিল্লীতে কংগ্রেস পার্টির প্রার্থী হিসাবে নির্বাচনে অংশ নেন। কংগ্রেসের ওই সময়ের নেতা ছিলেন রাজিব গান্ধী। তার প্রতিদ্বন্দ্বী ছিলেন ওই সময়ের শীর্ষ হিন্দু জাতীয়তাবাদী নেতা, ভারতীয় জনতা পার্টির এল কে আদভানী। নির্বাচনে রাজেশ অল্প ভোটের ব্যবধানে হেরে যান। কিন্তু এর পর তিনি আর একটি উপ-নির্বাচনে জয়ী হয়ে সংসদে আসেন।
পশ্চিম বঙ্গের বর্তমান মূখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জী ওই সময় ছিলেন সংসদের একজন জুনিয়র সদস্য। রাজেশ খান্নার স্মৃতিচারণ করে প্রেস ট্রাস্ট অব ইন্ডিয়া (পিটিআই) কে তিনি বলেন, “তিনি ছিলেন একজন নির্ভেজাল মানুষ। সাধারণ মানুষের সমস্যাগুলোকে তিনি তুলে ধরতেন। জাতীয় উন্নতির প্রশ্নে তিনি সকল পার্টির নেতাদের সঙ্গেই বিতর্ক করতে পছন্দ করতেন”।
মন্তব্য পোস্ট করুন (মন্তব্য দেয়া সম্পর্কিত নীতিমালা)* আবশ্যক ঘরগুলো নির্দেশ করছে
পাঠকের মন্তব্য
nelavathi suppiahJuly 23, 2012 @ 05:07:31AM
তার সিনেমার গানগুলো ছিল অসাধারণ ৷ তার অভিনয় আমার অত্যন্ত ভালো লাগে, খুবই চমৎকার....
Pradeep BhatiaJuly 22, 2012 @ 08:07:14PM
দীর্ঘমেয়াদি অসুস্থতাটা কি ছিল সেই সম্পর্কে কিছু বলা হয়নি ৷