আধ্যাত্মিক সম্মানের উপর প্রতিষ্ঠিত এক বন্ধন, ভক্তদের জন্য তাদের তীর্থস্থানে পৌঁছাতে সাহায্য করছে।
সেই ১৮৫০ সালে, বোতা মালিক, দক্ষিন কাশ্মীরের আনান্টাং অঞ্চলের একজন মুসলমান রাখাল বালকের খুব সামান্যই ধারনা ছিল যে তার একটি গুহা আবিস্কার, কাশ্মীর উপত্যকার হিন্দু মুসলমানদের মধ্যে সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির এক উপায় হিসাবে আবির্ভূত হবে।
আর ঠিক তাই ঘটেছিল। এখন প্রায় একশত বছরেরও বেশি হয়ে গেল, তার আবিস্কার হিন্দু তীর্থযাত্রীদের আধ্যাত্মিক পথ সন্ধানে মুসলমান জনগনের সাথে এক সম্মানের অংশীদারিত্বের সম্পর্ক তৈরিতে সাহায্য করেছে, যেখানে তারা তাদের পবিত্র স্থানে পৌঁছাতে এবং ফিরে আসতে নির্দেশনা দিচ্ছে।
এখন আজ অবধি, একশ বছরেরও পরে, যখন হিন্দু তীর্থযাত্রীরা অমরনাথ যাত্রার এ কষ্টসাধ্য পথ গ্রহণ করে, তাদের মুসলমান ভাইয়েরা প্রতি বছরে এর সফলতার জন্য সম্ভাব্য ,সব ধরনের সহযোগিতার হাত বাড়িয়ে দেয়।
৮২ বছরের প্রেম নাথ, উত্তর ভারতের রাজস্থানের প্রত্যন্ত এক গ্রামের সাধক, তার হৃদয় নিংড়ানো কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেছেন তার “ঘোড়াওয়ালা”, কাশ্মীরি মুসলমান আলী মোহাম্মাদের প্রতি, যে তাকে পবিত্র অমরনাথ গুহায় পৌঁছাতে সাহায্য করেছে, যেটি হিন্দু ভক্তদের কাছে অপরিসীম সম্মানের এক মঠ।
“আমি আলীর প্রতি কৃতজ্ঞ”, ছয় ঘন্টায় পথটি অতিক্রম করার পর খবর সাউথ এশিয়াকে নাথ বলেন। “গত বছরও, আমি আমার প্রণাম দিয়ে গিয়েছিলাম। আমার এত ভাল লাগছিল যখন মুসলমান ভাইয়েরা আমাদের স্বাগত জানায়, প্রতি পদে পদে। আমাদের মুসলমান ভাইদের সাহায্য যদি না থাকত, তাহলে এ তীর্থযাত্রা কখনো সফল হতনা”।
হিমালয়ের গভীর পাদদেশে অবস্থিত, অমরনাথ গুহা এক পবিত্র মঠ, যা হিন্দু ভক্তদের কাছে প্রবলভাবে সম্মানিত। এর মধ্যে রয়েছে ঠান্ডায় জমাট চুনের দন্ড, এখানকার মানুষের মতে যা অলৌকিকভাবে বাড়ে আবার মিলিয়ে যায়।
“২রা আগস্ট শেষ হওয়া পূজায় প্রায় ৬০০০ তীর্থযাত্রী তাদের প্রণাম দিয়েছে”, তীর্থযাত্রীদের দেখাশোনাকারী শ্রী অমরনাথ মঠ বোর্ডের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা নবীন কে চৌধুরী বলেন।
স্থানীয়দের জীবিকার এক উৎস
২৪ বছর বয়সী দারোয়ান সোহায়েল আহমেদ উৎসাহের সাথে এই বিশেষ তীর্থযাত্রীদের জন্য অপেক্ষা করে থাকে, হিন্দু ভাইদের সফল যাত্রাতে সাহায্য করার জন্য। “এই দুই মাসের জন্য, আমি ২৪ ঘন্টা কাজ করি, তীর্থযাত্রীদের সাহায্য করার জন্য, যাতে করে তারা কোন রকম কষ্ট ছাড়া পবিত্র গুহায় পৌঁছাতে পারে”, সে খবরকে জানায়।
“আমি, আমার দুই ভাই সহ, খুব কঠোর পরিশ্রম করি প্রতি বছর, কারণ, আমাদের পরিবার এর উপর নির্ভরশীল”, সোহায়েল জানায়।
এমনকি, ১৯৯০ সালের সহিংস দাঙ্গার সময়, এবং একইভাবে ২০১০ সালের ছড়িয়ে পড়া অস্থিতিশীল অবস্থার সময়ও, এই ভক্ত তীর্থযাত্রীরা কোন রকম সমস্যা ছাড়াই তাদের কাজ শেষ করে, এবং তা স্থানীয়দের সর্বাত্মক সহায়তা নিয়ে। তাদের অতিথি পরায়নতার জন্য প্রশংসিত, স্থানীয় কাশ্মীরি তাদের সহযোগিতার হাত সম্প্রসারন করে এবং ভক্তদের যে কোন পরিস্থিতি থেকে রক্ষা করে- তা সে জঙ্গীদের হুমকি হোক অথবা পাথরের আঘাত হোক।
স্থানীয় সোনামারগ দোকানদার, ৫৪ বছরের আলী মোহাম্মাদ বলতাল পাহারা চৌকি থেকে প্রায় ১০ কিমি দূরে তার কাজ করেন।
“পৃথিবী জানে যে অতীতে এবং এমনকি বর্তমানে, কাশ্মীরের জনগন সমর্থন দিয়ে আসছে এবং অমরনাথ ভক্তদের রক্ষা করে আসছে, নানান ধরনের পরিস্থিতির সম্মুখীন হওয়া সত্বেও”, তিনি খবরকে বলেন।
আলীর মতামত ভক্ত দিল্লীর ২১ বছর বয়সী মানব শর্মার মুখে প্রতিধ্বনিত হল। সে ২০১০ সালের অস্থিতিশীল অবস্থার সময়কার একটি ঘটনা স্মরণ করে, যখন তার চাচা পাথর ছুঁড়ে তেড়ে আসা এক দঙ্গল উচ্ছৃঙ্খল জনতার আক্রমণ থেকে স্থানীয় কাশ্মীরিদের দ্বারা রক্ষা পেয়েছিল।
“আমার চাচা অমরনাথ মঠের পথে ছিল, এবং ঐ পথের কোনস্থানে পাথর ছুড়ে মারামারি চলছিল”, শর্মা বলেন। “অমরনাথের একজন তীর্থযাত্রী (যাত্রী) বুঝতে পেরে, কিছু সংখ্যক স্থানীয় কাশ্মীরি তাকে রক্ষার জন্য এগিয়ে আসেন এবং সামনে এগিয়ে যাওয়ার জন্য তাকে পথ করে দেন”।
হিন্দু হিসাবে তার সে তীর্থযাত্রার সময়ে কাশ্মীরীদের কাছ থেকে পাওয়া সাহায্যের জন্য সে কৃতজ্ঞ ছিল, আলী বলে।
আধ্যাত্মিক পুরস্কার এবং ভবিষ্যতের আশা
বাৎসরিক দুই মাসের এ যাত্রা, যখন বেশীরভাগ স্থানীয় কাশ্মীরি শ্রমিকদের জন্য এক কর্মসংস্থান, এটি এছাড়াও আধ্যাত্মিক পুরস্কার হিসাবে বিবেচিত হচ্ছে।
দক্ষিন কাশ্মীরের পাহালগামের ৩৬ বছর বয়সী “ঘোড়া ওয়ালা”(ঘোড়ার চালক) ফারুক আহমেদ বলেন, সে কদাচিৎ ভক্তদের সাথে দামাদামি করে থাকে কারন, সে নিশ্চিত জানে যে, এ পবিত্র দায়িত্ব কাজ করার পর, সে আল্লাহ্র কাছ থেকে সরাসরি অনেক পুরস্কার পাবে।
“আর তাই, আমি আল্লাহ প্রদত্ত পুরস্কার বেশী পছন্দ করি, টাকা পয়সা থেকে”, আহমেদ বলেন। “এটা কোন বিষয় নয় আমার জন্য যে তারা হিন্দু। আমি বিশ্বাস করি, আল্লাহ এক, যদিও আমাদের প্রার্থনার ধরন আলাদা”।
কাশ্মীরিদের জন্য সবচেয়ে স্থায়ী সুবিধা হল যে, বাৎসরিক এ যাত্রা হিন্দু তীর্থযাত্রীদের কাশ্মীর অবস্থা সম্বন্ধে সচেতন করবে, ফলে আরো অনেক হিন্দু ভক্তরা অস্থিতিশীল রাজ্যের শান্তিপূর্ণ ভবিষ্যতের জন্য প্রার্থনা করবে।
অরুনাচল প্রদেশের জাফরান রঙের কাপড় পরিহিত, ৭২ বছর বয়সী ঋষি এক মন্তব্যে খবরকে বলেন,“অতীতে কাশ্মীর এমন অনেক খারাপ সময় প্রত্যক্ষ করেছে, কিন্তু বর্তমানে আমি প্রভু শিবার কাছে প্রার্থনা করেছি সুন্দর এবং শান্তিপূর্ণ এক কাশ্মীরের জন্য”।
শান্তির সেই বার্তায় এবং সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিতে, অমরনাথ তীর্থযাত্রা একশ বছরেরও বেশী সময় ধরে চলে আসছে।
মন্তব্য পোস্ট করুন (মন্তব্য দেয়া সম্পর্কিত নীতিমালা)* আবশ্যক ঘরগুলো নির্দেশ করছে
পাঠকের মন্তব্য
Mrinal BaruaMarch 26, 2013 @ 07:03:33AM
আমাদের এগিয়ে যাওয়া দরকার। আমাদের অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য আমরা একটি চমৎকার ভবিষ্যত তৈরি করতে চাই।
latifgoniSeptember 21, 2012 @ 12:09:31AM
এই নিবন্ধটি আমার ভালো লেগেছে
farooq khanSeptember 18, 2012 @ 04:09:56AM
সব পাঠকদের জন্য শিক্ষামূলক ৷
uttam kumarSeptember 16, 2012 @ 09:09:49AM
এই নিবন্ধটি অত্যন্ত ভালো ৷
ArshidAugust 4, 2012 @ 11:08:40AM
ভালো লেগেছে!
mostafizur rahmanAugust 4, 2012 @ 09:08:10AM
ভালো ধারণা, স্বাগতম ৷