গৃহযুদ্ধের সময় উত্তর ও দক্ষিণের সাথে সংযোগ সাধনকারী রেল লাইনগুলো ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল ৷ সেগুলো পুনর্নির্মাণ করা হলে পরিবার-পরিজনের সাথে পুনর্মিলনে সুবিধা হবে এবং অর্থনীতিতে সুফল বয়ে আনবে ৷
বেশিরভাগ শ্রীলংকানেরজন্য পরিবার-পরিজনের সাথে যোগাযোগ রাখাটা গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু লিবারেশন টাইগার্স অব তামিল ইলম(এলটিটিই) এর সাথে তিন-দশকের সংঘাত উত্তরাঞ্চলে আত্মীয়-স্বজন আছে এমন লোকজনের জন্য তা কঠিন করে তুলেছিল৷
এখন, এই বন্ধন আবার প্রতিষ্ঠিত হওয়ার জন্য দেশটির উত্তর-দক্ষিণ রেল লাইনগুলো পুননির্মাণের জন্য ব্যাপক বিনিয়োগকে ধন্যবাদ জানাতে হবে ৷
কলম্বোর একজন বাসিন্দা এস. পেরিয়াস্বামী স্মরণ করেন যে তিনি কীভাবে তার পরিবারের সাথে দেখা-সাক্ষাৎ করার জন্য প্রতি সপ্তাহে জাফনায় যেতেন ৷
শুক্রবারে তার অফিস শেষ হওয়ার পর, তিনি সন্ধ্যার ট্রেনে উঠতেন ৷ এই ভ্রমণে দশ ঘন্টা সময় লাগতো, পরের দিন সকালে তিনি তার গন্তব্যে গিয়ে পৌঁছাতেন ৷ রবিবার রাতে, তিনি ফিরতি ট্রেন ধরে কলম্বোতে ফিরে আসতেন ৷
১৯৯০ সালের জুন মাসে কয়েকটি ধারাবাহিক বোমা হামলায় উত্তরাঞ্চলের ট্রেন সার্ভিস সম্পূর্ণভাবে বন্ধ হয়ে গেলে তিনি খুব কম ক্ষেত্রেই তার বাড়িতে যেতে পারতেন ৷
“ট্রেন সার্ভিস বন্ধ হয়ে যাওয়ার পরে, আমার প্রতি সপ্তাহে জাফনা যাওয়া কমে যায়,” খবর দক্ষিণ এশিয়াকে বলেছেন ৬২ বছর বয়সী পেরিয়াস্বামী৷ “আমি কখনো কখনো মাসে একবার যেতাম ৷ বেশি সময় কলম্বোতে থাকার কারণে, আমি পার্টি ও বিয়ের অনুষ্ঠানের মত গুরুত্বপূর্ণ পারিবারিক অনুষ্ঠানগুলো মিস করেছি”,পুনর্গঠন কার্যক্রম এগিয়ে চলছে।
রেল সংযোগ পুনস্থাপনে সাহায্য করার জন্য, প্রতিবেশী ভারত শ্রীলংকাকে ৮০০ মিলিয়ন ডলার ঋণ দিয়েছে, যা ২০ বছরের মধ্যে পরিশোধ করতে হবে ৷ উত্তর ও দক্ষিণের গুরুত্বপূর্ণ শহর ও নগরীর মধ্যে সংযোগ স্থাপনকারী মোট ২৫০ কিলোমিটার দীর্ঘ রেললাইন ইতিমধ্যেই চার পর্যায়ে পুনর্নির্মাণ করা হয়েছে ৷
এই প্রকল্পের সাথে সম্পৃক্ত ভারতীয় সরকারি সংস্থা ইরকন ইন্টারন্যাশনালের মহা ব্যবস্থাপক এস.এল. গুপ্তের মতে, আগামী বছরের শেষদিকে উত্তরাঞ্চলের সবগুলো রেললাইনের কাজ শেষ হবে ৷
গুপ্ত বলেন, উত্তরাঞ্চলের মেদাওয়াচচিয়া ও মাধুর মধ্যবর্তী ৪৩ কিলোমিটার রেললাইনের পুনর্নির্মাণ আগামী ফেব্রুয়ারির মধ্যে শেষ হবে ৷ তারপর আগামী জুন মাসের মধ্যে এই রেললাইন উত্তর প্রদেশের পশ্চিমাঞ্চলের থালাইমান্নার পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা হবে ৷
“আমরা এখন এই লাইনগুলোতে ট্র্যাক সংযোগের কাজ করতে যাচ্ছি,” খবরকে বলেছেন তিনি, এবং সেইসাথে যোগ করেছেন, “আমরা নির্ধারিত সময়ের অনেক আগেই আমাদের কাজ শেষ করবো”।
জাফনা থেকে কলম্বো পর্যন্ত রেললাইন সহ, উত্তরাঞ্চলের অন্যান্য প্রধান প্রধান শহরগুলোকে সংযোগকারী লাইনগুলোর বাকি কাজ ২০১৩ সালের ডিসেম্বরের মধ্যে শেষ করার জন্য সময়সূচি ঠিক করা হয়েছে ৷
“রেলস্টেশনগুলোকে আধুনিকায়ন করা হবে,” বলেছেন গুপ্ত ৷ “নির্মাণ কাজ শেষ হলে, এই লাইনগুলোর উপর দিয়ে ঘন্টায় সর্বোচ্চ ১২০ কিলোমিটার বেগে ট্রেন চলাচল করতে পারবে”।
অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধারের জন্য একটি ইঞ্জিন-- বিশ্লেষকরা বলেন, উত্তর ও দক্ষিণের মধ্যে পুনর্গঠিত রেল যোগাযোগ উল্লেখযোগ্য অর্থনৈতিক সুফল বয়ে আনবে ৷
লার্ণিং ইনিশিয়েটিভ অন রিফর্মস ফর নেটওয়ার্ক ইকোনোমিকস এশিয়া (এলআইআরএনই) এর নির্বাহী পরিচালক রোহান সামারাজিভার মতে, গৃহযুদ্ধের আগে শ্রীলংকান রেলওয়ে তার বেশিরভাগ রাজস্ব পেয়েছে উত্তরাঞ্চলের রেললাইনগুলো থেকে, এবং এই রেললাইনগুলোর পুনর্গঠন নগদ অর্থের সংকটে থাকা এই প্রতিষ্ঠানটিকে উঠে দাঁড়াতে সাহায্য করবে ৷
“এখন, শ্রীলংকান রেলওয়ে মালামাল পরিবহনের মাত্র ২%, এবং যাত্রী পরিবহনের মাত্র ৫% এর অংশীদার ৷ এই লাইনগুলোতে আমাদেরকে আরো বেশি করে মাল বহনকারী ট্রেন চালাতে হবে ৷ আমাদেরকে মাল বহনের উপর মনোযোগ দিতে হবে ৷ তখনই, এটা লাভজনক হবে,” খবরকে বলেছেন সামারাজিভা ৷
উত্তর-দক্ষিণ রুট সম্পর্কে তিনি বলেন, “আমি এটাকে বলি মেইনলাইন ৷ এটা আমাদের অর্থনীতির জন্য অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ”।
শ্রীলংকান রেলওয়ের মহা-ব্যবস্থাপক জি.এ.পি. আরিয়ারত্নে অনুরূপ দৃষ্টিভঙ্গি পোষণ করেন ৷ আরিয়ারত্নে খবরকে বলেন, “এই লাইনগুলোর পুনর্নির্মাণ জাতীয় অর্থনীতিকে ব্যাপকভাবে সাহায্য করবে”।
“সিলন পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন ইতিমধ্যেই রেলযোগে জাফনায় জ্বালানী পরিবহনের সম্ভাব্যতা যাচাই করেছে ৷ যদি আমরা জ্বালানী সরবরাহের জন্য তাদের সাথে একটা চুক্তি করতে পারি, তাহলে আমরা বাড়তি আয় করতে পারবো,” বলেছেন তিনি, এবং সেইসাথে যোগ করেছেন, এই ধরনের একটা চুক্তি অর্থ-সাশ্রয়ী হবে ৷
তিনি যোগ করেন, এছাড়াও রেল সংযোগের ফলে কৃষিজাত পণ্যের পরিবহন আরো সহজ ও ব্যয়-সাশ্রয়ী হবে ৷
তবে, শুধু অর্থনৈতিক ক্ষেত্রেই সম্ভাব্য সবগুলো সুফল পাওয়া যাবে, তা নয়৷ উত্তরাঞ্চলের রেললাইনগুলো চালু করা হলে, তা বিভিন্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে সাংস্কৃতিক বন্ধন জোরদার করারও সম্ভাবনা রয়েছে ৷
উত্তরাঞ্চলের মান্নারের বিশপ রেভ. রায়াপ্পু জোসেফ বলেন, এই সংযোগের ফলে মাধুর পবিত্র রোমান ক্যাথলিক গীর্জায় বার্ষিক ভোজ উপলক্ষে দক্ষিণাঞ্চল থেকে তীর্থযাত্রীর সংখ্যা বাড়বে ৷ এই গীর্জাটি মান্নার জেলায় অবস্থিত ৪০০-বছরের পুরনো একটি ক্যাথলিক ম্যারিয়ান সমাধিমন্দির ৷ এটি তীর্থযাত্রা, অলৌকিক নিরাময় ও সব মানুষের জন্য প্রার্থনার একটি জায়গা হিসেবে কাজ করে ৷
“রেল সার্ভিস পুনরায় চালু হলে, আমরা বেশি সংখ্যক পুণ্যার্থীকে এখানে আসতে দেখবো,” বলেছেন জোসেফ ৷ “উত্তরাঞ্চলে ধর্মীয় উপাসনার জন্য আরো জায়গা আছে, যেমন জাফনাতে নাল্লুর কান্দাশামি হিন্দু মন্দির এবং নাগাদিপা বৌদ্ধ মন্দির ৷ ওই সব জায়গাগুলোতে যাতায়াতের জন্য ট্রেন সার্ভিস তীর্থযাত্রীদের জন্য একটি আরামদায়ক যোগাযোগ ব্যবস্থা হয়ে উঠবে”।
প্রাক্তন যাত্রী পেরিয়াস্বামী বলেন, এটা হবে মহামূল্যবান স্মৃতি পুনরায় ফিরে আসার মতো একটা ব্যাপার ৷ “আমার তারুণ্যে ভরপূর অতীতের স্মৃতিগুলো আবার ফিরে আসছে,” বলেছেন তিনি ৷ “আশা করি আমি আবার জাফনা থেকে কলম্বোতে ট্রেনে করে যাতায়াত করতে পারবো”।
মন্তব্য পোস্ট করুন (মন্তব্য দেয়া সম্পর্কিত নীতিমালা)* আবশ্যক ঘরগুলো নির্দেশ করছে
পাঠকের মন্তব্য
tamilselviSeptember 15, 2012 @ 08:09:20AM
খুব ভালো ৷ ভালো সিদ্ধান্ত নিন ৷ সমস্যার সমাধান ৷
anandSeptember 13, 2012 @ 08:09:22AM
খুব খারাপ
Ramadoss VenkatesSeptember 11, 2012 @ 01:09:18AM
এটা খুব ভালো খবর ৷ শ্রীলংকান ও তামিল উভয় জনগোষ্ঠীর জন্য শান্তি বজায় রাখা হলে আমরা প্রশংসা করতে পারি ৷ দেশটির পুনর্গঠনের জন্য ভারত শ্রীলংকাকে সাহায্য করতে পারে, কিন্তু অন্যদের ক্ষতি করার জন্য সামরিক প্রশিক্ষণ দেয়া উচিত হবে না ৷ শ্রীলংকান ও তামিলরা তাদের পার্থক্যগুলো দূর করা উচিত এবং খুশিমনে একসাথে থাকা উচিত ৷ সেইক্ষেত্রে শ্রীলংকান ও তামিলরা ভারতে আসতে পারে ৷ আমরাও ভয়-ভীতি ছাড়া শ্রীলংকায় যেতে পারি ৷ আমরা ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি যাতে আমরা সবসময় অন্যদেরকে শুধুমাত্র ভালো জিনিসগুলো শেখাতে পারি এবং তাদেরকে সাহায্য করতে পারি ৷
M.L.FrancisSeptember 8, 2012 @ 09:09:56AM
আমি ট্রেনে করে ভ্রমণ করার পক্ষে খুব বেশি বুড়ো হয়ে গেছি ৷ কিন্তু আমি নিশ্চিত যে জাফনা থেকে কলম্বো পর্যন্ত ট্রেনে করে যাতায়াত করতে পারলে অনেকেরই উপকার হবে ৷
DHAMODHARAN.MSeptember 8, 2012 @ 05:09:41AM
আমি তামিল সংস্করণ চাই
bhuviSeptember 3, 2012 @ 02:09:35AM
খুব ভালো
m s m riyadSeptember 2, 2012 @ 05:09:57AM
অত্যন্ত চমৎকার, আমার খুব পছন্দ হয়েছে ৷
chithambaramAugust 30, 2012 @ 12:08:11AM
এটা একটা ভালো প্রকল্প যা ক্ষতিগ্রস্ত তামিল লোকজনের জন্য সবচেয়ে উপকারী হবে৷
s abdul muthalibAugust 27, 2012 @ 02:08:38PM
এটা একটা চমৎকার খবরের চ্যানেল ৷ পুথজিয়া থালাই মুরাই-এর খবরটা আমার কাছে ভালো লেগেছে ৷
chitraAugust 27, 2012 @ 08:08:08AM
খুবই ভালো
kumaresunAugust 23, 2012 @ 06:08:33AM
এই নিবন্ধটি ভালো কিন্তু আমি ইংরেজি জানি, অন্যথায় তামিল হলে ভালো
c.d.narendranathAugust 21, 2012 @ 01:08:34AM
ভারত সরকার শ্রীলংকায় থাকা ভারতীয়দেরকে সাহায্য করার জন্য ভালো মনোভাব নিয়ে সম্ভাব্য সবকিছু করছে৷ সেই সাথে সিংহলি ও তামিলদের মধ্যে দীর্ঘমেয়াদী শান্তির জন্য তাদের মধ্যকার পার্থক্যগুলোকে দূর করার জন্য তাদেরকে সম্ভাব্য সব ব্যবস্থা নিতে হবে ৷
Eugene SittampalamAugust 14, 2012 @ 04:08:06PM
তার বন্ধুদের মধ্য থেকে, জাফনার একজন মানুষ তার “ঘনিষ্ঠতম বন্ধু” হিসেবে নিঃসন্দেহে একজন সিংহলিকেই বেছে নেবে, এর কারণ হলো একজন সাধারণ সিংহলি তার বন্ধুর জন্য প্রয়োজন হলে জীবন দিতেও দ্বিধা করে না ৷ (আমি নিজে জাফনার একজন গর্বিত তামিল, আমি দক্ষিণের পানাডুরায় জন্মগ্রহণ করেছি এবং জীবনের একটা বড় অংশ সেখানকার অভিজাত সিংহলি সম্প্রদায়ের সাথে কাটিয়েছি ৷ তথাকথিত সাম্প্রদায়িক বা জাতিগত যে সমস্যাগুলো আমরা এই দ্বীপে দেখেছি সেগুলো শুরু করেছিল এবং সেগুলো অব্যাহত ছিল মূলত রাজনীতিবিদদের মধ্যে (এই বিভক্তির উভয় দিকেরই), যা আমাদের এককালের চমৎকার দেশের একটি সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রজাতি ৷ এই রেললাইন আমাদের সেরেনদ্বীপের দুইটি চমৎকার সংস্কৃতিকে পুনরায় সংযুক্ত করুক এবং তাদের মধ্যে পুরাতন বন্ধুত্ব জাগিয়ে তুলুক ৷ সবাইকে ধন্যবাদ, ও শুভেচ্ছা!